পবিত্র রমজান সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে সোমবার (২৬ অক্টোবর) বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। একই সাথে সমকাল, ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা ও বাংলা ট্রিবিউন তিনটি আউটলেটই দাবিটি লিটারপ্রতি ১৪ টাকা বলে উল্লেখ করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া নেই।

খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের দাবি

বৈঠকে খেজুর আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে খেজুর আমদানিতে প্রায় ৫৫ শতাংশ শুল্ক ও কর দিতে হয়। উচ্চ শুল্কায়নমূল্য ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় পণ্য পরিবহনে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে এবং বিকল্প পথে পণ্য আনতে হয়ে খরচ বাড়ছে। এছাড়া ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা অব্যাহত থাকলে রমজানে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।

মন্ত্রীর মতামত ও এনবিআর সাথে আলোচনা

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশে মিসর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় এক ডজন দেশ থেকে বিভিন্ন মানের খেজুর আমদানি হয়। সব ধরনের খেজুরের জন্য একই শুল্কায়নমূল্য নির্ধারণ করা হলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই খেজুরের জাত, মান ও প্রকৃত মূল্য বিবেচনায় যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর সাথে আলোচনা করা হবে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

আমদানির আড়্ডে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের ৭ লাখ ৫ হাজার টনের চেয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার টন বেশি। চিনি আমদানি ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন (গשת বছরের চেয়ে ১ লাখ ৫৩ হাজার টন বেশি), ছোলা ৮২ হাজার টন (গשת বছরের ১২ হাজার টনের চেয়ে ৭০ হাজার টন বেশি), মসুর ডাল ১ লাখ ২২ হাজার টন (৬৪ হাজার টন বেশি) এবং খেজুর ১১ হাজার টন (গשת বছরের ৪ হাজার টনের চেয়ে বেড়েছে)।

ছোট ডাল মিলের সংকট ও পোল্ট্রি খাতের অবস্থা

বৈঠকে বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী নেসার উদ্দিন বলেন, দেশে ছোলার চাহিদা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর এবং মোট ডাল চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। বড় ব্যবসায়ীদের কারণে ছোট ডাল মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। তিনি ছোট ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানে সরকারি উদ্যোগ চেয়েছেন। অন্যদিকে পোল্ট্রি খাতের প্রতিনিধিরা জানান, বর্তমানে ডিম ও মুরগির উৎপাদন স্বাভাবিক; খামার পর্যায়ে ডিমের দাম প্রতি পিস ১১.৫ টাকা থেকে কমে ১০ টাকার নিচে এসেছে। বড় রোগবালাইয়ের অভাবের কারণে রমজানে উৎপাদন ও সরবরাহে উল্লেখযোগ্য সংকটের আশঙ্কা নেই বলে তারা মনে করেন।

আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি ও সরকারের আশ্বাস

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পর্যালোচনায় জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা বাড়লেও মসুর ডালের দাম কমেছে। বর্তমানে ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে কোনো শুল্ক-কর নেই। চিনি ও ফল আমদানির বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা করে যৌক্তিক সমন্বয় করা হলে বাজারে দাম সহনীয় রাখতে সহায়ক হতে পারে। বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সময়মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার আহ্বান জানিয়েছেন এবং সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠন, বিটিটিসি, এনবিআর, টিসিবি, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, এফবিসিসিআই, পুলিশ, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।