খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে বড় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রোববার দুটি পৃথক মামলা দায়ের করেছে। সমকাল, ইনকিলাব ও ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলাগুলো খুলনা সমন্বিত জেলা আদালতে দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক আশিকুর রহমান বাদী হলে দায়ের করা হয়েছে।

দুই মামলার অভিযোগ

প্রথম মামলায় কাজ না করেই ঠিকাদারকে এক কোটি ৫৫ লাখ টাকা বিল প্রদানের অভিযোগ আনা হয়েছে। দ্বিতীয় মামলায় ঠিকাদারের অনুকূলে অর্থ ছাড় করে ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা রাজস্ব হিসেবে স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে। তিনটি উৎসই এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

আসামি ৮ জন, কিন্তু কারা বাদে?

মামলার আসামিরা হলেন: ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান খান লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান, মাহাবুব ব্রাদার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মাহাবুব রহমান, এবং খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) এর প্রধান প্রকৌশলী কাজী সাবিরুল আলম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামীম জেহাদ, প্রকল্প পরিচালক মো. আরমান হোসেন, নির্বাহী প্রকৌশলী মুনতাসির মামুন, সহকারী প্রকৌশলী বাসুদেব কুমার বিশ্বাস ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী শরীফ ওয়াহিদুজ্জামান।

তবে সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়ের নেপথ্যে ভূমিকা রাখা কেডিএর চেয়ারম্যান, সচিব, সদস্য (উন্নয়ন) ও সদস্য (প্রশাসন) কাউকেও আসামি করা হয়নি। ইনকিলাব ও ঢাকা পোস্টও এই তথ্য সমর্থন করেছে। মূল অভিযুক্তদের মামলা থেকে বাদ দেওয়াটি নিয়ে সমালোচনা চলছে বলে সমকাল জানিয়েছে।

মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটির সুপারিশ ভিন্ন

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি তিন সদস্যসহ মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছিল। কেডিএর সদস্য (উন্নয়ন) এস এম মাহমুদুর রহমান, সদস্য (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসেন ও সাবেক সচিব মো. বদিউজ্জামানের বিরুদ্ধে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে এবং বাকি ১১ জনের বিরুদ্ধে কেডিএতে বিভাগীয় মামলা চলছে। কিন্তু দুদক ওই তিন সদস্যকেও বাদ দিয়েছে। সমকাল অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ও চেয়ারম্যান পদে থাকা সামরিক কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে কিছু উল্লেখ করেনি।

প্রকল্পে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের প্রভাব

কেডিএ কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা তিনটি পত্রিকাকেই জানিয়েছে, শিপইয়ার্ড সড়কের কাজ চলাকালে পুরো বিষয়টি দেখভাল করতেন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় ঠিকাদার মাহবুবুর রহমান প্রকল্পের প্রকৌশলীদের পাত্তা দিতেন না। কাজে কোনো ভুল হলে সংশোধন বা চিঠি দিতেও ভয় পাতেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা। বিল থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অধিকাংশই তারা নিতেন। ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ থাকা ১৩ কোটি টাকার বিল তৈরির নির্দেশ দেন চেয়ারম্যান ও সচিব। তাদের নির্দেশে নিচের প্রকৌশলীরা বিল তৈরি করতেন।

কেডিএর নথি অনুমোদন ও বিল প্রদানের নির্দেশিকা অনুযায়ী, নিম্নমান সহকারী থেকে প্রধান প্রকৌশলীর পর সদস্য (প্রকৌশল), সচিব, সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) ও চেয়ারম্যান অনুমোদন করেন। এরপর চেয়ারম্যান ও সচিব যৌথভাবে বিলে স্বাক্ষর করেন।

প্রকল্পের ইতিহাস ও ব্যয় বেড়েছে

প্রসঙ্গত, শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায় ২০১৩ সালের ৭ মে। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ছিল ৯৮ কোটি টাকা। দীর্ঘ ১৩ বছরেও সড়কটির কাজ শেষ হয়নি। উল্টো ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮০ কোটি টাকা। সমকাল অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওই সড়কে অভিযান চালায় দুদক। সড়কে কাজের ধীরগতি দেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তদন্তের নির্দেশ দেন। পৃথক দুটি তদন্ত গত সেপ্টেম্বর মাসে শেষ হয়। (এই তথ্য শুধু সমকালে পাওয়া যায়, অন্যান্য দুটি উৎসে নেই।)

দুদকের প্রতিক্রিয়া ও নাগরিক সমাজের দাবি

দুদকের খুলনা জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্তকালে যদি অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে তাদেরও আসামি করা হবে। খুলনা মহানগর নাগরিক ফোরামের কো-চেয়ারম্যান সরদার আবু তাহের মনে করেন, পুরো বিষয়টি দুঃখজনক। দীর্ঘ ১৩ বছর তারা মানুষকে কষ্ট দিয়েছে। শিপইয়ার্ড সড়কের অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে দৃষ্টিমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে পুনঃতদন্ত করতে হবে।