বাংলাদেশে চলমান হাম প্রাদুর্ভাবের পর প্রাণঘাতী আরও তিন রোগ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও হানা দিতে পারে। গতকাল সোমবার বিশেষজ্ঞদের তথ্যের বরাত দিয়ে এএফপির প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
p>জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত স্বাধীন কমিটি একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেখানে উঠে এসেছে তথ্যগুলো। অক্টোবরের শুরুর দিকে গবেষণা চালান বিশেষজ্ঞরা। পরে তারা জানান, হামের প্রাদুর্ভাব দেশের অবনতিশীল টিকাদান ব্যবস্থার অবস্থা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও সতর্কসংকেত।
p>স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে হাম মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। এ পর্যন্ত রোগটিতে ১ হাজার ২০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে দুই লাখ ২০ হাজার মানুষ। কয়েক দশকের মধ্যে এটি দেশে হামের সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব।
p>মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশের মাত্র ৮২ শতাংশ শিশু পূর্ণাঙ্গ টিকা পেয়েছে। অথচ জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ৯৫ শতাংশ। এ ছাড়া টিকাদান কর্মীদের প্রায় ৪০ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ছিল। ১৯৭৯ সালে কর্মসূচি শুরুর পর বাংলাদেশ পোলিও ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার নির্মূল করেছে। পাশাপাশি রুবেলা ও হেপাটাইটিস-বি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছিল।
p>প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বড় আকারে পারটুসিস বা হুপিং কাশি, ডিপথেরিয়া এবং এমনকি টিকা থেকে উদ্ভূত পোলিও ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার।
p>প্রসঙ্গত, প্রথম আলো জানিয়েছে, হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ার জটিলতা দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা শিশুদের জীবনকে সংকটাপন্ন করেছে। শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, মূল সমস্যা তৈরি হচ্ছে চিকিৎশা শুরু করতে দেরি হওয়ায়।
p>প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালে আসা শিশুদের প্রায় ৯০ শতাংশই অপুষ্টিতে ভুগছে। অপুষ্টির কারণে তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা একেবারেই ভেঙে পড়ে, যা তাদের জীবন সংকটাপন্ন করে তুলছে। হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার মার্জিয়া আফরোজের ভাষ্য, নবজাতক থেকে দুই বছর বয়সী শিশুরা হামে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
p>প্রথম আলো জানিয়েছে, হামে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিশু শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৯৭ থেকে ৯৮টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ৯০ শতাংশ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে।
p>স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, টিকাদান কর্মসূচিতে কোল্ড চেইন টেকনিশিয়ানের ৫৩ শতাংশ পদ, স্বাস্থ্য সহকারীর ৩৪ শতাংশ পদ এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সদরদপ্তরের ৪৫ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া তদারকিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদে শূন্যতার হার ৩২ থেকে ৪৩ শতাংশের মধ্যে।
p>প্রতিবেদনে টিকাদান কার্যক্রমের পরিকল্পনাগত দুর্বলতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক যোগ্য শিশু টিকা পায় না। বিশেষ করে, শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং দুর্গম এলাকার জনগোষ্ঠী টিকাদান সেবা পেতে বিভিন্ন বাধার মুখে পড়ে।
p>প্রতিবেদনে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) একটি টাস্কফোর্সের সরাসরি তত্ত্বাবধানে শূন্য পদগুলোতে দ্রুত জনবল নিয়োগ। একই সঙ্গে টিকাদানের বয়সসীমা-সংক্রান্ত নীতিতে পরিবর্তন আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
p>স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জাহিদ রায়হান বলেন, সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যত দ্রুত সম্ভব টিকাদানকর্মী নিয়োগ দিতে যাচ্ছি আমরা। সরকারের পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, টিকা সহায়তাকারী জোট গ্যাভি এবং অন্যান্য সহযোগী সংস্থার সহায়তায় চলতি মাসের শুরুতে ৭০ সদস্যের একটি দল দেশের টিকাদান কর্মসূচি মূল্যায়নে কাজ শুরু করে।
p>প্রসঙ্গত ২০২৪ সালে পরিকল্পিত হামবিরোধী টিকাদান কর্মসূচি অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পিছিয়ে যায়। ২০২৫ সালের কর্মসূচিও ধর্মঘট ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ব্যাহত হয়। এরপর কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে হাম আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
p>হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে সহজেই ছড়ায়। এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এর জটিলতার মধ্যে রয়েছে মস্তিষ্কে প্রদাহ এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে গুরুতর সমস্যা। বিশেষ করে ছোট শিশুরা এ রোগে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
p>হুপিং কাশি শিশুদের, বিশেষ করে নবজাতক ও অল্পবয়সী শিশুদের গুরুতর অসুস্থতা এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ডিপথেরিয়া শ্বাসনালি বন্ধ করে দিতে পারে এবং হৃৎপিণ্ড ও স্নায়ুর ক্ষতি করতে পারে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত টিকা না পাওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে উদ্ভূত পোলিও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে পক্ষাঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
p>সূত্র: সমকাল ও প্রথম আলো






