চট্টগ্রামে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলায় পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বিহারী বগাকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন আদালত। একই মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন চাওয়া তার ১২ সহযোগীর জামিনও নামঞ্জুর করা হয়েছে। পৃথক আরেকটি মামলায় বগার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক এ জি এম মনিরুল হাসান সরকার পৃথক দুটি মামলার শুনানি শেষে এসব আদেশ দেন। চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে জানান, বগা অন্য একটি মামলায় আগে থেকেই কারাগারে ছিলেন। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় খুলশী থানায় করা মামলায় তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। একই মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করা বাকি ১২ আসামির জামিনও নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়তলী কলেজের অধ্যক্ষের করা আরেকটি মামলায়ও বগার জামিন আবেদন শুনানির জন্য ছিল। ওই মামলায় তিনি এত দিন হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে ছিলেন। গতকাল (সোমবার) জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় আজ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন তার আইনজীবীরা। শুনানি শেষে আদালত সেই আবেদনও নামঞ্জুর করেন।
গত ৬ অক্টোবর হত্যা-হুমকি, চাঁদাবাজি, বসতঘরে ঢুকে ভাঙচুর ও ক্ষতিসাধনের অভিযোগে খুলশী থানায় মামলা করেন নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা শেখ মুহাম্মদ আরিফ। মামলায় বগাসহ ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়। এর আগে গত ১৮ অক্টোবর ওই মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেছিলেন বগা। আদালত সেদিন তার জামিন নামঞ্জুর করলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকে তিনি চট্টগ্রাম কারাগারে রয়েছেন।
পুলিশের অপরাধসংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার পিসিপিআর অনুযায়ী, চাঁদাবাজি, হত্যাচেষ্টা, বিস্ফোরক ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় বগার বিরুদ্ধে ২৩টি মামলা রয়েছে। চলতি বছরের জুনে সরকারি জায়গা দখল নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনায় আলোচনায় আসেন বগা। ওই ঘটনার পর ৮ জুন তাকে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় তার নাম সামনে এলেও একাধিক অভিযান চালিয়েও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
গত সেপ্টেম্বরে পাহাড়তলী কলেজের এক শিক্ষককে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগে করা মামলায় বগাকে প্রধান আসামি করা হয়। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালালে তার অনুসারীরা সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় পুলিশের ওপর হামলা ও পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যে বাসার ভেতরের একটি সুড়ঙ্গপথ দিয়ে বগা পালিয়ে যান বলে জানা গেছে।
এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির তালতলা এলাকায় হৃদয় নামের এক কিশোর ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। ওই ঘটনায় জড়িত কিশোরেরা একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলে জানা গেছে। গ্যাংটি পরিচালনায় বগার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায়ও তাকে গ্রেপ্তারে একাধিক অভিযান চালায় পুলিশ।
বগাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় নগরের টাইগারপাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নগর ভবনে পুলিশের অভিযানকে কেন্দ্র করে। গত ৬ অক্টোবর সেখানে বগার অবস্থানের তথ্য পেয়ে পুলিশের একটি বড় দল ভবনটি ঘিরে ফেলে। অভিযোগ রয়েছে, ভবনের ভেতরে থাকা তৎকালীন মেয়র শাহাদাত হোসেনের হস্তক্ষেপের পর বগাকে গ্রেপ্তার না করেই ফিরে যায় পুলিশ। পরে বগা নগর ভবন থেকে চলে যান।
পরদিন শাহাদাত হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, নগর ভবনে ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা নামের কেউ আসেননি। তবে পুলিশের লোকেশন রেকর্ড অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর রাতে বগার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের অবস্থান নগর ভবনের আশপাশে ছিল বলে জানা গেছে। এ ঘটনার পর অভিযান পরিচালনাকারী খুলশী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রহিমের সমালোচনা করেন শাহাদাত হোসেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে এক-দুই দিনের মধ্যে তাকে চট্টগ্রামের বাইরে বদলি করা হয়।







