ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চিঠি পাঠানো এবং সীমান্তের কাছে উত্তর কোরিয়ার একটি হাউইটজার (সামরিক কামান) দেখা যাওয়ার পর এ সপ্তাহে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা চরমে উঠেছে।
সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার একটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সীমান্ত এলাকা দেখে সংবাদমাধ্যমের একজন প্রতিনিধি নিশ্চিত করেছেন, সীমান্তের কাছে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান স্থানে উত্তর কোরিয়ার একটি কামান বসানো আছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা ইউনহাপ জানায়, অস্ত্রটি ১২২ মিলিমিটারের স্বচালিত হাউইটজার। সীমান্তের কাছে এমন কামানের প্রকাশ্য প্রদর্শন বিরল বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে। এছাড়া দক্ষিণ দিকে কামানের নল তাক করা উত্তর কোরিয়ার তিনটি সাঁজোয়া যান এবং অসামরিক অঞ্চলে (ডিএমজেড) ভেতরে ২০ থেকে ৩০ জন উত্তর কোরীয় সেনা বেড়া নির্মাণের কাজ করছিলেন।
সিউলের কিয়ংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিম ইউল-চুল মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার জন্য কামান এত স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে এটি দেখিয়ে উত্তর কোরিয়া কথা নয়, কাজের মাধ্যমে বার্তা দিচ্ছে যে তারা সংলাপ বা আলোচনার বদলে শক্তি প্রয়োগে সীমান্তনীতি কার্যকর করতে চায়।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কেসিএনএ জানায়, রবিবার পাঠানো চিঠিতে জাতিসংঘে দেশটির প্রতিনিধি বলেছেন, সীমান্তে পিয়ংইয়ংয়ের নির্মাণকাজকে সামরিক অনুপ্রবেশ হিসেবে দেখাতে সিউল স্থলমাইনের ঘটনাকে ব্যবহার করছে। চিঠিতে উত্তর কোরিয়া সতর্ক করেছে, তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হলে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে এবং এর পরিণতির সম্পূর্ণ দায় দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর বর্তাবে। গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়া নিরাপত্তা পরিষদে যে চিঠি পাঠায়, উত্তর কোরিয়ার চিঠিটি তারই জবাব। ঐ চিঠিতে বলা হয়েছিল, ২১ সেপ্টেম্বর ডিএমজেডে ঘটা বিস্ফোরণের মাইন উত্তর কোরিয়ার সেনারা পুঁতেছিল, যা কোরীয় যুদ্ধের সময়কার যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। ডিএমজেডের তদারককারী জাতিসংঘ কমান্ড বলেছে, সীমান্ত রেখার ওপরে উত্তর কোরিয়ার মাইন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। পিয়ংইয়ং দায় অস্বীকার করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র সোমবার বলেন, উত্তর কোরিয়ার চিঠিতে তাদের আগের অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে এবং কথিত সীমানারেখা চিহ্নিতকরণের কাজকে যৌক্তিক দেখানোর চেষ্টা আছে। হাউইটজার মোতায়েন নিয়ে মন্ত্রণালয় আলাদা কোনো মন্তব্য করেনি। সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে সিউল উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছে।
কূটনৈতিক সংকট
ঘটনার সূত্রপাত ২১ সেপ্টেম্বর। কোরীয় উপদ্বীপের দুই অংশকে পৃথক করে রাখা নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চলে মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হন; তাদের মধ্যে দুজন গুরুতর আহত হন। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী ও জাতিসংঘ কমান্ডের তদন্তে বলা হয়, সামরিক সীমারেখার দক্ষিণ দিকে উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইন থেকেই বিস্ফোরণ ঘটেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। কিন্তু পিয়ংইয়ং অভিযোগ অস্বীকার করেছে। উত্তর কোরিয়ার দাবি, দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্তে তাদের প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ বাধাগ্রস্ত করতে ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণের বিরুদ্ধে সীমান্তে তাদের সেনাদের লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক গুলি চালানোর অভিযোগ তুলেছে।
বিরোধের গভীরে অবিশ্বাসের ইতিহাস
দুই কোরিয়ার বর্তমান উত্তেজনাকে শুধু একটি মাইন বিস্ফোরণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটটি আড়ালে থেকে যায়। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটেছিল যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে, পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে নয়। ফলে কয়েক দশক পরও সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং পরস্পরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অবিশ্বাস আরো গভীর হয়েছে। উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সামরিক প্রতিরোধ জোরদার করেছে। পিয়ংইয়ং এসব সহযোগিতাকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে; অন্যদিকে সিউল উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক বলে বিবেচনা করে।
সংঘাত বড় হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু পরিকল্পিত যুদ্ধ নয়, বরং ভুল হিসাব থেকে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া। সীমান্তে সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান, মাইন, সতর্কতামূলক গুলি এবং ভারী অস্ত্রের উপস্থিতির মধ্যে ছোট একটি ঘটনা দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে। একটি পক্ষের সীমিত সামরিক পদক্ষেপের জবাবে অন্য পক্ষ আরো শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।







