বাংলা ট্রিবিউন অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাত গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের শেষ দিনে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ এই সতর্কতা জানান।

তিনি বলেন, অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন, ঋণখেলাপি, অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। অধিকাংশ ব্যাংক এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের অর্থনীতি আরও বড় সংকটে পড়তে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যে লাইনচ্যুত হয়েছে; প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ধনীদের স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রবণতা বন্ধ না হলে অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফেরানো সম্ভব হবে না।

মাহবুব উল্লাহ অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ একটি শোষণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে যেখানে স্বল্পসংখ্যক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সুবিধা ভোগ করছেন। রাষ্ট্র নিজেই অলিগার্ক গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। রাষ্ট্রের এই চরিত্র পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।

সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা। বাংলা ট্রিবিউন অনুযায়ী, তিনি জানান, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে অলস তারল্যের পরিমাণ ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। একদিকে কিছু দুর্বল ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক তীব্র তারল্যসংকটে ভুগছে, অন্যদিকে সামগ্রিক খাতে বিপুল অর্থ অলস পড়ে আছে।

বরকত-এ-খোদা অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করেন: রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল সুশাসন, নমনীয় নীতিমালা ও বারবার ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ, এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি। তার উপস্থাপনায় দাবি করা হয়, ভুয়া ঋণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে আনুমানিক পাঁচ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। পাশাপাশি আড়াই লাখ কোটি থেকে তিন লাখ কোটি টাকা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকের কিছু পরিচালক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী উপযুক্ত জামানত বা ঋণ পরিশোধের সদিচ্ছা ছাড়াই অর্থ নিয়েছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নেটওয়ার্ক অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে গেছে। এসব অনিয়ম প্রতিরোধে ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করা, ঋণ অনুমোদন ও আদায়ে জবাবদিহি বাড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।

দেশ রূপান্তরও একই সম্মেলনের রিপোর্টে মাহবুব উল্লাহর সতর্কতা নিশ্চিত করেছে: অর্থনীতি শুধু লাইনচ্যুতই হবে না, হয়তো বড় কোনো বিপর্যয়ে (নদীতে) গিয়ে পড়বে।